Home/
Unlabelled
/Lalon geeti তোমার আখরোট আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেব মেয়ে
শুধু বয়ঃসন্ধি দিয়ে এই ঘোর কলিকালে মহব্বত বিন্দুমাত্র পাত্তা পাবে না
প্রাপ্তবয়স্ক হও। যে জীবন নিতান্তই অভদ্র ভাদ্রের
শত ঋতু যাবে তবু জীবের জীবনে জেনো কখনই তিলমাত্র বসন্ত আসবে না ।
অতএব ছেলে হও। প্রেম তুমি বাইরের খোলসটুকু ফেলে দিয়ে দেখো
নগ্ন ও সুন্দর যিনি অন্তরে তিনিই ছেলে অথচ প্রকৃতি হয়ে সেজেছেন মেয়ে
নিত্যদিন তাঁরই পূজা বিশ্বব্যাপী, তিনি হেন নিত্য আশ্রয়
কই আর? কে আছে এ ত্রিভূবনে ধ্বংসে যুদ্ধে সর্বনাশে বিধ্বস্ত কঠিন সময়ে?
টের পাই কোথাও ফুটেছে ফুল কোথাও অমল স্নিগ্ধ শান্ত সরোবরে
ফুটেছে কমল, আর চতুর্দিক আমোদিত গন্ধে বর্ণে স্বাদে রসে রূপে
দাও তীব্র আস্বাদন। যেন ছেড়ে চলে যাই লিঙ্গবানদের তৈরি লোহার শহর
কমলনগরে যাই সেখানে পুরুষ নাই, আছেন প্রকৃতি শুধু: সৌম্য স্থির আপন স্বরূপে।
উত্থিত লিঙ্গের মতো বড় বড় দালান অট্টালিকা টাওয়ার ও পুরুষালি কীর্তি চিহ্নগুলি
বীর্যপাতের পরে পড়ে আছে। যথেষ্ট ঘুরেছি আমি শহরে শহরে, মেয়ে, যথেষ্ট খুঁজেছি অলিগলি
তোমার রটনা আছে অথচ ঠিকানা নাই, কেউই জানে না প্রেম ছেলে নাকি মেয়ে; কোন্ বাড়ি
প্রেমের নিজের। শুধু প্রতিটি ছাদের রোদে নিঃসঙ্গ পতাকা দেখি। গূঢ় নীল শাড়ি
উড়ছে দিগন্তব্যাপী। একটি আখরোট গাছে ধরেছে নিষিদ্ধ ফল। পেড়ে নিয়ে
নিষ্কামে লিপ্সাহীন তোমার আখরোট আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেবো, ছেলে।
এ যুগ মেয়েদের যুগ। প্রেমে যে উন্মাদ শুধু তার মধ্যে আছে কিছু হুঁশ।
লিঙ্গ চিহ্ন নির্বিশেষে প্রত্যেকেই মেয়ে আর প্রেমই শুধু একমাত্র পুরুষ।।
... ... ... ... ... ... ...
দুনিয়াতে পুরুষ একজনই, আর সবাই মেয়ে। আর যিনি পুরুষ তিনি দৃশ্যের অতীত শুধু নন, লিঙ্গেরও অতীত। লিঙ্গ কথাটার অর্থ চিহ্ন। অর্থাৎ তিনি চিহ্নের অতীত। ভাবান্দোলনের এটা গোড়ার কথা। নদিয়ায় গৌরাঙ্গ জাতপাত, শ্রেণি ও নারীপুরুষভেদ বিরোধী লড়াইয়ের সূচনাই শুধু করেন নি, তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করে ভাবান্দোলনের ধারা ফকির লালন শাহ অবধি জাতিভেদ, শ্রেণীভেদ ও নারীপুরুষ ভেদ বিরোধী লড়াই অব্যাহত রেখেছে। নিজেদের নাভির দাগ আমরা এখন দেখি না বা নজরে আনতে অক্ষম। ধার করা চিন্তা বাইরে থেকে যা আনি তা গোড়ার বুনিয়াদ মজবুত করার কাজে লাগে না। জীর্ণ প্রাসাদের দেয়ালে রঙ লাগানোর অধিক কিছু হয় না। একটা উদাহরণ দেই।
পুরুষতন্ত্রের প্রবল প্রতাপ ও প্রকট দাপটে আমরা মনে করি নারীর মুক্তি নারীর পুরুষ হয়ে ওঠার মধ্যে। পুরুষতন্ত্রে পুরুষই ক্ষমতাবান, অতএব নারীর ক্ষমতায়ন ঘটবে পুরুষের মতো হতে পারলে। ক্ষমতায়নের মডেল কিন্তু পুরুষ। পুরুষের মতো কাপড়চোপড় পরলে, পুরুষের মতো আচরণ রপ্ত করলে, পুরুষের মতো সিগারেট ফুঁকলে, পুরুষের মতো গাড়ি এরোপ্লেন, বোমারু বিমান, ট্যাংক, মেশিনগান ইত্যাদি চালাতে পারলে ক্ষমতাবান হওয়া যাবে। কারণ ক্ষমতা আর পুরুষ সমার্থক। অনুমান হচ্ছে পুরুষের এই ক্ষমতা তার বায়োলজি থেকে আসে। পুরুষের শরীর থেকে উৎপন্ন হয়। সমাজ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি বা রাজনীতি থেকে আসে না। অতএব নারীর বায়োলজি যাই হোক, তাকে পুরুষ হবার সাধনাই করতে হবে, এটাই নারীমুক্তির পথ। নারীবাদ তখন কার্যত পুরুষতন্ত্রেরই আরেকটি রূপ ও ধারা হয়ে পুরুষতন্ত্রের নতুন উপদ্রব হয়ে হাজির হয়।
নদিয়া এ পথে যায় নি। নারী বা পুরুষ কারুরই মুক্তি পুরুষ হবার মধ্যে নয়, লিঙ্গবান হবার মধ্যে তো নয়ই। অর্থাৎ পুরুষকে আরও পুরুষ, আর নারীকে আরও নারী হবার মধ্যে নয়। এমনকি লিঙ্গহীন হওয়ার মধ্যেও নয়। নারী, পুরুষ, ট্রন্সজেণ্ডার আপনি যাই হন, মুক্তির সাধনা বায়োলজির পক্ষে বা বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়, বরং এর আশ্রয়ে যিনি যুগলে বাস করেন তাঁর লড়াইকে আরও গভীরে, আরও গোড়ায় নিয়ে যাওয়া। এ না হলে মুক্তি, মোক্ষ, নির্বাণ ইত্যাদির অর্থ মানুষ ও প্রকৃতির অভেদ অবস্থান থেকে বোঝা দায়। ঔপনিবেশিক শৃংখল ভাঙা, সামন্ত শাসন থেকে মুক্তি, পুঁজির বন্ধন ছিন্ন করা, সাম্রাজ্যবাদী সম্পর্কের পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা অর্জন ইত্যাকার শেকল ভাঙার গান আমরা বুঝি। বুঝতে অসুবিধা হয় না। দৃশ্যমান সে লড়াই অব্যাহত আছে, অব্যাহত থাকবে। এখানে সেই ‘মুক্তি’র কথা হচ্ছে না। আরও গোড়ায় না গিয়ে বুঝলে এই সকল ক্ষেত্রের বিজয়ও বিস্বাদ হয়ে যাবে অচিরেই। ইতিহাসে এই অভিজ্ঞতা মানুষের যথেষ্ট হয়েছে।
প্রকৃতি থেকে নিজেকে আলাদা দেখা, আলাদা ভাবা দৈনন্দিনতার অংশ। এমনকি নিজের শরীরকেও যখন আমি দেখি, ভাবি যে এই জিনিসটা বুঝি আমার বাইরেরই কোন একটা জিনিস। আমার শরীরে আমি বাস করি কিন্তু নিজের শরীরকেও আমার ‘ অপর’ বা বাইরের সত্য মনে হয়। এতে আমরা বিস্ময় বোধ করি না আর। আমি আর আমার বাহির আলাদা -- এই মায়াচ্ছন্ন ঘোরকেই সত্য জ্ঞান করে চলি। এটা কি অসুখ? কি এটা? অথচ চোখ মুদলেই জগৎ একাকার হয়ে যায় তারপরও মানুষ প্রকৃতি বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে আলাদা ভেদবুদ্ধিকেই একমাত্র সত্য ভাবে।
কেবল ‘দৃষ্টি’ বা ‘দর্শন’-এর পূজা – এটাই চলছে এখন। এই এক কলিযুগ যেখানে দেখা, দর্শন ও প্রমাণই শুধু সত্য, আর সবই মিথ্যা। মানুষের অপরাপর অঙ্গ ও বৃত্তির প্রতিভাকে অস্বীকার করাই এই যুগে রীতি ও আইন। চোখসর্বস্ব মানুষের এই যুগ আসলে অন্ধের যুগ। জাহেলি। এই পরিস্থিতিতে যখন গায়েব কিম্বা অনুপস্থিতির স্বাদ ও সত্য উপলব্ধির কথা মানুষ বলাবলি করে অন্ধ সেটা বুঝতে পারে না। ভাবে, কি নিয়ে জানি কথা হচ্ছে ! মিস্টিরিয়াস ও আধ্যাত্মিক ব্যাপার মনে হয় তার কাছে। তার নিজের যে অঙ্গবৈকল্য ঘটেছে সেদিকে তার খেয়াল নাই। তার ঘ্রাণ, নাই, শ্রুতি নাই, স্পর্শ নাই, স্বাদ নেবার রস নাই – আছে শুধু বিশাল দানবীয় একটা চোখ। কেউ মনে করিয়ে দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ভাবে এইসব মৌলবাদীদের কারসাজি! জ্ঞানকর্তা হয়ে নিজেকে প্রকৃতি থেকে আলাদা ভাবা, প্রকৃতিকে নিছকই জ্ঞানের বিষয়ে পর্যবসিত করা চোখসর্বস্ব প্রতিবন্ধীদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এই দুর্দশা থেকে মুক্তি মানে তো অঙ্গবৈকল্যের শুশ্রুষা। শৃঙ্খলতা, পরাধীনতা ইত্যাদি থেকে 'মুক্তি' দরকার, কিন্তু অঙ্গবৈকল্যের চিকিৎসা তো এতে হবে না। দৃষ্টির যুগ অতিক্রম করে দিব্যযুগে প্রবেশ ছাড়া সেটা কিভাবে সম্ভব?
ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ডকে আলাদা ভাবা বা মানুষ ও প্রকৃতির বিভাজনের জমি থেকে পুরুষতন্ত্র উঠে আসে। প্রকৃতিকে মানুষ থেকে আলাদা জ্ঞান করে মানুষকেই প্রকৃতির অধিকর্তা ভাবা, অধিকর্তার অহং নিয়ে প্রকৃতির ওপর প্রবল দাপট দেখিয়ে বেড়ানো, যুদ্ধবিগ্রহ, হিংসা, রক্তপাত, শত্রু মিত্রে ভাগ হয়ে যাওয়া – এই সকল ঘটনা ও দুর্ঘটনা পুরুষতন্ত্রের জমিতে বীর্যপাত হতে থাকলে ক্রমাগত ঘটতেই থাকবে। ফকিরফ্যাকড়াদের ভাষ্য হচ্ছে নালা দিয়ে যখন তখন পানি পড়া বন্ধ না হলে এইসবও বন্ধ হবে না। পুরুষতন্ত্র বা পুরুষালি ধর্ম অতএব সমভাবে প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসেরও কারন। প্রকৃতি স্বরূপা নারী শুধু নয়, পুরা প্রকৃতিকেই সে তার দখলদার সম্পত্তি বলে মনে করে। জগৎ ধ্বংসের এই সকল গোড়ার কারণ মোকাবিলা ও বিনাশের অর্থ হচ্ছে মূলত পুরুষতন্ত্রের মোকাবিলা ও বিনাশ।
দুই
একে রুখবার পথ কি? একটি প্রস্তাব হচ্ছে যিনি আছেন সর্ব্ত্র ও সর্বব্যাপী এক হয়ে, মানুষে ও সৃষ্টিতে সমভাবে একাকার করে – যিনি আছেন বলেই অন্য সবকিছু ‘আছে’ হয়ে ওঠে, -- জগত ‘নাই’ না হয়ে ‘আছে’ হয়, সেই ‘এক’- এর কাছে নিঃশর্তে আত্মসমর্পন করা। তাঁর আবেদ, বান্দা বা দাস হওয়া। বান্দা হওয়াই সত্যিকারের মুক্ত মানুষের সাধনা, কর্তা হওয়া নয়। সুলতানি আমলে নদিয়া এই ভাব দ্বারা প্রবল ভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এই দিকটা এখনও আমাদের নজরের বাইরে রয়ে গিয়েছে।
মানুষ ও প্রকৃতির ভেদ মোচনের জন্য সুলতানি আমলে চৈতন্য ‘মেয়ে’ হবার সাধনাকে একটি সম্ভাব্য পথ আকারে হাজির করলেন। ‘রাধা ভাবে উপাসনা’। অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ বহিরঙ্গে রাধা। যুগল। যে ‘অপর’, যিনি প্রকৃতিস্বরূপা, তার স্বাদ কেমন তার আস্বাদন নেবার জন্য তিনি উন্মুখ হয়ে উঠলেন। সকল ইন্দ্রিয় ও বৃত্তিসহ আস্বাদন প্রবল ভাবে শারীরিক ব্যাপার। বুদ্ধিবৃত্তিক না। এর মধ্যে মূর্ছা যাওয়া, বেহুঁশ হওয়া, অপরের মধ্যে বিলীন বা ‘ফানাফিল্লাহ’ হওয়া সবই আছে। সেই ‘অপর’-এর দাস হবার সাধনা ছিল গৌরাঙ্গের, তার অধিকর্তা হওয়া নয়। কিন্তু একে তিনি স্থাপন করলেন পুরোহিতের মন্দিরে নয় লোককথার ভাবের হাটে । সাধারণ মানুষের প্রেমের গল্পে ও সংকল্পে।
কৃষ্ণ ভগবান, কিন্তু রাধার সঙ্গে প্রেম করেছেন পুরুষের মতো। এতে ‘ভগবান’ নামের অখ্যাতি রটেছে। কারণ নারী কিভাবে প্রেমে শিহরিত হয় এই অভিজ্ঞতা তাঁর নাই। অতএব নারীর প্রেম কি জিনিস তিনি জানেন না। প্রকৃতির প্রেমমাধূর্য কি জিনিস ভগবান হয়েও তিনি জানতে পারলেন না। ভগবানের এই অপূর্ণতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রথাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, ধর্মশাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্বের অবসান ঘটালেন গৌরাঙ্গ। পুরানা কৃষ্ণের মৃত্যু ঘটিয়ে ধরায় নিজেই সাক্ষাৎ ভগবান হয়ে হাজির হলেন। পাশ্চাত্যে নীটশে প্রমুখ ভগবানের মৃত্যু ঘোষণা দিল চৈতন্যের বহু পরে। কিন্তু ভগবানহীন এতিম বিশ্ব এরপর কি করবে তার কোন দিশা তাঁরা দিতে পারলেন না। মানুষের মহিমা প্রতিষ্ঠার জন্য ঈশ্বরকে মেরে ফেলা হোল। কিন্তু তারপর কি? মানুষ তো জীবমাত্র নয়। পরিণতিতে বস্তুর পূজা, ভোগের দাসত্ব ও নিহিলিজমের অন্ধত্ব ছাড়া জীবের আশ্রয় আর কিছুই রইল না। বুদ্ধিকে ঈশ্বরের জায়গায় বসিয়ে বুদ্ধির পূজাকে ধর্ম বানাল তারা। একে তারা নাম দিল দর্শন। ভাবল এতেই ভগবানের দাফনকাফন সাঙ্গ হবে। ধর্মের বিলয় ঘটবে। কিন্তু মানুষ যেহেতু জীবমাত্র নয়, তাকে বশ করা গেল না। পাশ্চাত্য সভ্যতার গোড়ার সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠল।
আধুনিক বা আধুনিকতার পক্ষে মুখে ফেনা তোলা যায়, জাবরও কাটা যায়। কিন্তু যাই বলি, বুদ্ধিকে সকল বৃত্তির সর্দার বানানোর এই যুগ আদতে এখনও ধর্মতত্ত্বেরই যুগ, শাস্ত্র, আইন ও শাসনের যুগ। অস্ত্র হাতে কিম্বা আইন হাতে শাসন – কিছুই আসে যায় না। সত্য/মিথ্যার তর্ক চলছে তো চলছেই। ফলে শত্রু মিত্র ভেদবুদ্ধির ওপর দাঁড়ানো রাজনীতিও আছে। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি – মানুষ ভাবে এই সকল পুরানা যুগ তারা অতিক্রম করে এসেছে। কিন্তু এর বাইরে যাবার পথ কি? কি তার ধর্ম, আদর্শ, রাজনীতি? চৈতন্য বাংলাকে নাচিয়ে কাঁদিয়ে আরেক দিব্যযুগের সম্ভাবনা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারি নি। ভাষা, বলি, কাব্য বলি, সঙ্গীত বলি, ভাব বলি – এই এক কালপর্ব গিয়েছে সুলতানি আমলে যার ঢেউ এখনও আছড়ে পড়ছে যত্র তত্র বাংলার সর্বত্র। আমরা আধুনিকেরা এখনও এর অর্থ ধরতে পারি না।
এখানে দু জন মহাজনের গান উল্লেখ করছি।
১. হাওড়ে গোঁসাই
মেয়ে গঙ্গাযমুনা সরস্বতী রে
মাসে মাসে জোয়ার আসে ত্রিবেণি সংহতী রে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।।
যখন নদী হয় উতলা তিন জন মেয়ের লীলা খেলা
একজন কালা একজন ধলা একজন লালমতিরে
সেই নদীতে চান করিলে রং হয় গৌর মতিরে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী ।।
মেয়ের গুণ কে বলতে পারে কিঞ্চিত জানে মহেশ্বরে
একজন শিরে একজন বুকে ধরে পশুপতি
রসিক মেয়ে থাকলে ঘরে রসের জগৎ দেখে রে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।।
জ্ঞান নয়নে দেখ চেযে পুরুষ নয় সকলই মেয়ে
সাক্ষী তাহার গোপীর মেয়ে গোকুলে বসতি
সতী হয়ে ধর্ম রাখে লয়ে উপপতি রে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।।
এবার মলে মেয়ে হব কালারে নারী বানাব
মহতের কাছে চেয়ে নেব সাধনের রীতি নীতি
গোসাই হাউরে বলে রাখব না আর বংশে দিতে বাতিরে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।।
২. জালাল উদ্দিন খাঁ
চিন গে মানুষ ধরে, ও তুই চিন গে মানুষ ধরে
মানুষ দিয়া মানুষ বানাইয়া, সেই মানুষে খেলা করে
চিন গে মানুষ ধরে।।
কিসে দিব তার তুলনা কায়া ভিন্ন প্রমাণ হয় না
পশু-পক্ষী জীব আদি, যত এ সংসারে
দুইটি ভাণ্ডের পানি দিয়া, অষ্ট জিনিষ গড়ে -
তার ভিতরে নিজে গিয়ে আত্মরূপে বিরাজ করে
চিন গে মানুষ ধরে, ও তুই চিন গে মানুষ ধরে।।
মায়া সুতার জাল বুনিয়ে প্রেমের ঘরে ভাব জাগায়ে
প্রাণেতে প্রাণ মিশাইয়ে, রহে জগত জুড়ে
নবরঙ্গের ফুল ফুটিলে ভোমর আসে উড়ে -
ফুলের মধু দেখতে সাদা, আপনি খেয়ে উদর ভরে
চিন গে মানুষ ধরে, ও তুই চিন গে মানুষ ধরে।।
স-বুঝ নিয়ে দেখ চেয়ে, পুরুষ নহে সবই মেয়ে
থাকবে যদি পুরুষ হয়ে, চল ভেদ বিচারে
একটি পুরুষ নিজ সুরতে, জগত মাঝে ঘুরে—
লক্ষ নারীর মন যোগাইয়া প্রেমের মরা আপনি মরে
চিন গে মানুষ ধরে, ও তুই চিন গে মানুষ ধরে।।
Lalon geeti তোমার আখরোট আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেব মেয়ে
শুধু বয়ঃসন্ধি দিয়ে এই ঘোর কলিকালে মহব্বত বিন্দুমাত্র পাত্তা পাবে না
প্রাপ্তবয়স্ক হও। যে জীবন নিতান্তই অভদ্র ভাদ্রের
শত ঋতু যাবে তবু জীবের জীবনে জেনো কখনই তিলমাত্র বসন্ত আসবে না ।
অতএব ছেলে হও। প্রেম তুমি বাইরের খোলসটুকু ফেলে দিয়ে দেখো
নগ্ন ও সুন্দর যিনি অন্তরে তিনিই ছেলে অথচ প্রকৃতি হয়ে সেজেছেন মেয়ে
নিত্যদিন তাঁরই পূজা বিশ্বব্যাপী, তিনি হেন নিত্য আশ্রয়
কই আর? কে আছে এ ত্রিভূবনে ধ্বংসে যুদ্ধে সর্বনাশে বিধ্বস্ত কঠিন সময়ে?
টের পাই কোথাও ফুটেছে ফুল কোথাও অমল স্নিগ্ধ শান্ত সরোবরে
ফুটেছে কমল, আর চতুর্দিক আমোদিত গন্ধে বর্ণে স্বাদে রসে রূপে
দাও তীব্র আস্বাদন। যেন ছেড়ে চলে যাই লিঙ্গবানদের তৈরি লোহার শহর
কমলনগরে যাই সেখানে পুরুষ নাই, আছেন প্রকৃতি শুধু: সৌম্য স্থির আপন স্বরূপে।
উত্থিত লিঙ্গের মতো বড় বড় দালান অট্টালিকা টাওয়ার ও পুরুষালি কীর্তি চিহ্নগুলি
বীর্যপাতের পরে পড়ে আছে। যথেষ্ট ঘুরেছি আমি শহরে শহরে, মেয়ে, যথেষ্ট খুঁজেছি অলিগলি
তোমার রটনা আছে অথচ ঠিকানা নাই, কেউই জানে না প্রেম ছেলে নাকি মেয়ে; কোন্ বাড়ি
প্রেমের নিজের। শুধু প্রতিটি ছাদের রোদে নিঃসঙ্গ পতাকা দেখি। গূঢ় নীল শাড়ি
উড়ছে দিগন্তব্যাপী। একটি আখরোট গাছে ধরেছে নিষিদ্ধ ফল। পেড়ে নিয়ে
নিষ্কামে লিপ্সাহীন তোমার আখরোট আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেবো, ছেলে।
এ যুগ মেয়েদের যুগ। প্রেমে যে উন্মাদ শুধু তার মধ্যে আছে কিছু হুঁশ।
লিঙ্গ চিহ্ন নির্বিশেষে প্রত্যেকেই মেয়ে আর প্রেমই শুধু একমাত্র পুরুষ।।
... ... ... ... ... ... ...
দুনিয়াতে পুরুষ একজনই, আর সবাই মেয়ে। আর যিনি পুরুষ তিনি দৃশ্যের অতীত শুধু নন, লিঙ্গেরও অতীত। লিঙ্গ কথাটার অর্থ চিহ্ন। অর্থাৎ তিনি চিহ্নের অতীত। ভাবান্দোলনের এটা গোড়ার কথা। নদিয়ায় গৌরাঙ্গ জাতপাত, শ্রেণি ও নারীপুরুষভেদ বিরোধী লড়াইয়ের সূচনাই শুধু করেন নি, তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করে ভাবান্দোলনের ধারা ফকির লালন শাহ অবধি জাতিভেদ, শ্রেণীভেদ ও নারীপুরুষ ভেদ বিরোধী লড়াই অব্যাহত রেখেছে। নিজেদের নাভির দাগ আমরা এখন দেখি না বা নজরে আনতে অক্ষম। ধার করা চিন্তা বাইরে থেকে যা আনি তা গোড়ার বুনিয়াদ মজবুত করার কাজে লাগে না। জীর্ণ প্রাসাদের দেয়ালে রঙ লাগানোর অধিক কিছু হয় না। একটা উদাহরণ দেই।
পুরুষতন্ত্রের প্রবল প্রতাপ ও প্রকট দাপটে আমরা মনে করি নারীর মুক্তি নারীর পুরুষ হয়ে ওঠার মধ্যে। পুরুষতন্ত্রে পুরুষই ক্ষমতাবান, অতএব নারীর ক্ষমতায়ন ঘটবে পুরুষের মতো হতে পারলে। ক্ষমতায়নের মডেল কিন্তু পুরুষ। পুরুষের মতো কাপড়চোপড় পরলে, পুরুষের মতো আচরণ রপ্ত করলে, পুরুষের মতো সিগারেট ফুঁকলে, পুরুষের মতো গাড়ি এরোপ্লেন, বোমারু বিমান, ট্যাংক, মেশিনগান ইত্যাদি চালাতে পারলে ক্ষমতাবান হওয়া যাবে। কারণ ক্ষমতা আর পুরুষ সমার্থক। অনুমান হচ্ছে পুরুষের এই ক্ষমতা তার বায়োলজি থেকে আসে। পুরুষের শরীর থেকে উৎপন্ন হয়। সমাজ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি বা রাজনীতি থেকে আসে না। অতএব নারীর বায়োলজি যাই হোক, তাকে পুরুষ হবার সাধনাই করতে হবে, এটাই নারীমুক্তির পথ। নারীবাদ তখন কার্যত পুরুষতন্ত্রেরই আরেকটি রূপ ও ধারা হয়ে পুরুষতন্ত্রের নতুন উপদ্রব হয়ে হাজির হয়।
নদিয়া এ পথে যায় নি। নারী বা পুরুষ কারুরই মুক্তি পুরুষ হবার মধ্যে নয়, লিঙ্গবান হবার মধ্যে তো নয়ই। অর্থাৎ পুরুষকে আরও পুরুষ, আর নারীকে আরও নারী হবার মধ্যে নয়। এমনকি লিঙ্গহীন হওয়ার মধ্যেও নয়। নারী, পুরুষ, ট্রন্সজেণ্ডার আপনি যাই হন, মুক্তির সাধনা বায়োলজির পক্ষে বা বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়, বরং এর আশ্রয়ে যিনি যুগলে বাস করেন তাঁর লড়াইকে আরও গভীরে, আরও গোড়ায় নিয়ে যাওয়া। এ না হলে মুক্তি, মোক্ষ, নির্বাণ ইত্যাদির অর্থ মানুষ ও প্রকৃতির অভেদ অবস্থান থেকে বোঝা দায়। ঔপনিবেশিক শৃংখল ভাঙা, সামন্ত শাসন থেকে মুক্তি, পুঁজির বন্ধন ছিন্ন করা, সাম্রাজ্যবাদী সম্পর্কের পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা অর্জন ইত্যাকার শেকল ভাঙার গান আমরা বুঝি। বুঝতে অসুবিধা হয় না। দৃশ্যমান সে লড়াই অব্যাহত আছে, অব্যাহত থাকবে। এখানে সেই ‘মুক্তি’র কথা হচ্ছে না। আরও গোড়ায় না গিয়ে বুঝলে এই সকল ক্ষেত্রের বিজয়ও বিস্বাদ হয়ে যাবে অচিরেই। ইতিহাসে এই অভিজ্ঞতা মানুষের যথেষ্ট হয়েছে।
প্রকৃতি থেকে নিজেকে আলাদা দেখা, আলাদা ভাবা দৈনন্দিনতার অংশ। এমনকি নিজের শরীরকেও যখন আমি দেখি, ভাবি যে এই জিনিসটা বুঝি আমার বাইরেরই কোন একটা জিনিস। আমার শরীরে আমি বাস করি কিন্তু নিজের শরীরকেও আমার ‘ অপর’ বা বাইরের সত্য মনে হয়। এতে আমরা বিস্ময় বোধ করি না আর। আমি আর আমার বাহির আলাদা -- এই মায়াচ্ছন্ন ঘোরকেই সত্য জ্ঞান করে চলি। এটা কি অসুখ? কি এটা? অথচ চোখ মুদলেই জগৎ একাকার হয়ে যায় তারপরও মানুষ প্রকৃতি বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে আলাদা ভেদবুদ্ধিকেই একমাত্র সত্য ভাবে।
কেবল ‘দৃষ্টি’ বা ‘দর্শন’-এর পূজা – এটাই চলছে এখন। এই এক কলিযুগ যেখানে দেখা, দর্শন ও প্রমাণই শুধু সত্য, আর সবই মিথ্যা। মানুষের অপরাপর অঙ্গ ও বৃত্তির প্রতিভাকে অস্বীকার করাই এই যুগে রীতি ও আইন। চোখসর্বস্ব মানুষের এই যুগ আসলে অন্ধের যুগ। জাহেলি। এই পরিস্থিতিতে যখন গায়েব কিম্বা অনুপস্থিতির স্বাদ ও সত্য উপলব্ধির কথা মানুষ বলাবলি করে অন্ধ সেটা বুঝতে পারে না। ভাবে, কি নিয়ে জানি কথা হচ্ছে ! মিস্টিরিয়াস ও আধ্যাত্মিক ব্যাপার মনে হয় তার কাছে। তার নিজের যে অঙ্গবৈকল্য ঘটেছে সেদিকে তার খেয়াল নাই। তার ঘ্রাণ, নাই, শ্রুতি নাই, স্পর্শ নাই, স্বাদ নেবার রস নাই – আছে শুধু বিশাল দানবীয় একটা চোখ। কেউ মনে করিয়ে দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ভাবে এইসব মৌলবাদীদের কারসাজি! জ্ঞানকর্তা হয়ে নিজেকে প্রকৃতি থেকে আলাদা ভাবা, প্রকৃতিকে নিছকই জ্ঞানের বিষয়ে পর্যবসিত করা চোখসর্বস্ব প্রতিবন্ধীদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এই দুর্দশা থেকে মুক্তি মানে তো অঙ্গবৈকল্যের শুশ্রুষা। শৃঙ্খলতা, পরাধীনতা ইত্যাদি থেকে 'মুক্তি' দরকার, কিন্তু অঙ্গবৈকল্যের চিকিৎসা তো এতে হবে না। দৃষ্টির যুগ অতিক্রম করে দিব্যযুগে প্রবেশ ছাড়া সেটা কিভাবে সম্ভব?
ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ডকে আলাদা ভাবা বা মানুষ ও প্রকৃতির বিভাজনের জমি থেকে পুরুষতন্ত্র উঠে আসে। প্রকৃতিকে মানুষ থেকে আলাদা জ্ঞান করে মানুষকেই প্রকৃতির অধিকর্তা ভাবা, অধিকর্তার অহং নিয়ে প্রকৃতির ওপর প্রবল দাপট দেখিয়ে বেড়ানো, যুদ্ধবিগ্রহ, হিংসা, রক্তপাত, শত্রু মিত্রে ভাগ হয়ে যাওয়া – এই সকল ঘটনা ও দুর্ঘটনা পুরুষতন্ত্রের জমিতে বীর্যপাত হতে থাকলে ক্রমাগত ঘটতেই থাকবে। ফকিরফ্যাকড়াদের ভাষ্য হচ্ছে নালা দিয়ে যখন তখন পানি পড়া বন্ধ না হলে এইসবও বন্ধ হবে না। পুরুষতন্ত্র বা পুরুষালি ধর্ম অতএব সমভাবে প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসেরও কারন। প্রকৃতি স্বরূপা নারী শুধু নয়, পুরা প্রকৃতিকেই সে তার দখলদার সম্পত্তি বলে মনে করে। জগৎ ধ্বংসের এই সকল গোড়ার কারণ মোকাবিলা ও বিনাশের অর্থ হচ্ছে মূলত পুরুষতন্ত্রের মোকাবিলা ও বিনাশ।
দুই
একে রুখবার পথ কি? একটি প্রস্তাব হচ্ছে যিনি আছেন সর্ব্ত্র ও সর্বব্যাপী এক হয়ে, মানুষে ও সৃষ্টিতে সমভাবে একাকার করে – যিনি আছেন বলেই অন্য সবকিছু ‘আছে’ হয়ে ওঠে, -- জগত ‘নাই’ না হয়ে ‘আছে’ হয়, সেই ‘এক’- এর কাছে নিঃশর্তে আত্মসমর্পন করা। তাঁর আবেদ, বান্দা বা দাস হওয়া। বান্দা হওয়াই সত্যিকারের মুক্ত মানুষের সাধনা, কর্তা হওয়া নয়। সুলতানি আমলে নদিয়া এই ভাব দ্বারা প্রবল ভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এই দিকটা এখনও আমাদের নজরের বাইরে রয়ে গিয়েছে।
মানুষ ও প্রকৃতির ভেদ মোচনের জন্য সুলতানি আমলে চৈতন্য ‘মেয়ে’ হবার সাধনাকে একটি সম্ভাব্য পথ আকারে হাজির করলেন। ‘রাধা ভাবে উপাসনা’। অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ বহিরঙ্গে রাধা। যুগল। যে ‘অপর’, যিনি প্রকৃতিস্বরূপা, তার স্বাদ কেমন তার আস্বাদন নেবার জন্য তিনি উন্মুখ হয়ে উঠলেন। সকল ইন্দ্রিয় ও বৃত্তিসহ আস্বাদন প্রবল ভাবে শারীরিক ব্যাপার। বুদ্ধিবৃত্তিক না। এর মধ্যে মূর্ছা যাওয়া, বেহুঁশ হওয়া, অপরের মধ্যে বিলীন বা ‘ফানাফিল্লাহ’ হওয়া সবই আছে। সেই ‘অপর’-এর দাস হবার সাধনা ছিল গৌরাঙ্গের, তার অধিকর্তা হওয়া নয়। কিন্তু একে তিনি স্থাপন করলেন পুরোহিতের মন্দিরে নয় লোককথার ভাবের হাটে । সাধারণ মানুষের প্রেমের গল্পে ও সংকল্পে।
কৃষ্ণ ভগবান, কিন্তু রাধার সঙ্গে প্রেম করেছেন পুরুষের মতো। এতে ‘ভগবান’ নামের অখ্যাতি রটেছে। কারণ নারী কিভাবে প্রেমে শিহরিত হয় এই অভিজ্ঞতা তাঁর নাই। অতএব নারীর প্রেম কি জিনিস তিনি জানেন না। প্রকৃতির প্রেমমাধূর্য কি জিনিস ভগবান হয়েও তিনি জানতে পারলেন না। ভগবানের এই অপূর্ণতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রথাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, ধর্মশাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্বের অবসান ঘটালেন গৌরাঙ্গ। পুরানা কৃষ্ণের মৃত্যু ঘটিয়ে ধরায় নিজেই সাক্ষাৎ ভগবান হয়ে হাজির হলেন। পাশ্চাত্যে নীটশে প্রমুখ ভগবানের মৃত্যু ঘোষণা দিল চৈতন্যের বহু পরে। কিন্তু ভগবানহীন এতিম বিশ্ব এরপর কি করবে তার কোন দিশা তাঁরা দিতে পারলেন না। মানুষের মহিমা প্রতিষ্ঠার জন্য ঈশ্বরকে মেরে ফেলা হোল। কিন্তু তারপর কি? মানুষ তো জীবমাত্র নয়। পরিণতিতে বস্তুর পূজা, ভোগের দাসত্ব ও নিহিলিজমের অন্ধত্ব ছাড়া জীবের আশ্রয় আর কিছুই রইল না। বুদ্ধিকে ঈশ্বরের জায়গায় বসিয়ে বুদ্ধির পূজাকে ধর্ম বানাল তারা। একে তারা নাম দিল দর্শন। ভাবল এতেই ভগবানের দাফনকাফন সাঙ্গ হবে। ধর্মের বিলয় ঘটবে। কিন্তু মানুষ যেহেতু জীবমাত্র নয়, তাকে বশ করা গেল না। পাশ্চাত্য সভ্যতার গোড়ার সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠল।
আধুনিক বা আধুনিকতার পক্ষে মুখে ফেনা তোলা যায়, জাবরও কাটা যায়। কিন্তু যাই বলি, বুদ্ধিকে সকল বৃত্তির সর্দার বানানোর এই যুগ আদতে এখনও ধর্মতত্ত্বেরই যুগ, শাস্ত্র, আইন ও শাসনের যুগ। অস্ত্র হাতে কিম্বা আইন হাতে শাসন – কিছুই আসে যায় না। সত্য/মিথ্যার তর্ক চলছে তো চলছেই। ফলে শত্রু মিত্র ভেদবুদ্ধির ওপর দাঁড়ানো রাজনীতিও আছে। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি – মানুষ ভাবে এই সকল পুরানা যুগ তারা অতিক্রম করে এসেছে। কিন্তু এর বাইরে যাবার পথ কি? কি তার ধর্ম, আদর্শ, রাজনীতি? চৈতন্য বাংলাকে নাচিয়ে কাঁদিয়ে আরেক দিব্যযুগের সম্ভাবনা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারি নি। ভাষা, বলি, কাব্য বলি, সঙ্গীত বলি, ভাব বলি – এই এক কালপর্ব গিয়েছে সুলতানি আমলে যার ঢেউ এখনও আছড়ে পড়ছে যত্র তত্র বাংলার সর্বত্র। আমরা আধুনিকেরা এখনও এর অর্থ ধরতে পারি না।
এখানে দু জন মহাজনের গান উল্লেখ করছি।
১. হাওড়ে গোঁসাই
মেয়ে গঙ্গাযমুনা সরস্বতী রে
মাসে মাসে জোয়ার আসে ত্রিবেণি সংহতী রে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।।
যখন নদী হয় উতলা তিন জন মেয়ের লীলা খেলা
একজন কালা একজন ধলা একজন লালমতিরে
সেই নদীতে চান করিলে রং হয় গৌর মতিরে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী ।।
মেয়ের গুণ কে বলতে পারে কিঞ্চিত জানে মহেশ্বরে
একজন শিরে একজন বুকে ধরে পশুপতি
রসিক মেয়ে থাকলে ঘরে রসের জগৎ দেখে রে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।।
জ্ঞান নয়নে দেখ চেযে পুরুষ নয় সকলই মেয়ে
সাক্ষী তাহার গোপীর মেয়ে গোকুলে বসতি
সতী হয়ে ধর্ম রাখে লয়ে উপপতি রে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।।
এবার মলে মেয়ে হব কালারে নারী বানাব
মহতের কাছে চেয়ে নেব সাধনের রীতি নীতি
গোসাই হাউরে বলে রাখব না আর বংশে দিতে বাতিরে
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।।
২. জালাল উদ্দিন খাঁ
চিন গে মানুষ ধরে, ও তুই চিন গে মানুষ ধরে
মানুষ দিয়া মানুষ বানাইয়া, সেই মানুষে খেলা করে
চিন গে মানুষ ধরে।।
কিসে দিব তার তুলনা কায়া ভিন্ন প্রমাণ হয় না
পশু-পক্ষী জীব আদি, যত এ সংসারে
দুইটি ভাণ্ডের পানি দিয়া, অষ্ট জিনিষ গড়ে -
তার ভিতরে নিজে গিয়ে আত্মরূপে বিরাজ করে
চিন গে মানুষ ধরে, ও তুই চিন গে মানুষ ধরে।।
মায়া সুতার জাল বুনিয়ে প্রেমের ঘরে ভাব জাগায়ে
প্রাণেতে প্রাণ মিশাইয়ে, রহে জগত জুড়ে
নবরঙ্গের ফুল ফুটিলে ভোমর আসে উড়ে -
ফুলের মধু দেখতে সাদা, আপনি খেয়ে উদর ভরে
চিন গে মানুষ ধরে, ও তুই চিন গে মানুষ ধরে।।
স-বুঝ নিয়ে দেখ চেয়ে, পুরুষ নহে সবই মেয়ে
থাকবে যদি পুরুষ হয়ে, চল ভেদ বিচারে
একটি পুরুষ নিজ সুরতে, জগত মাঝে ঘুরে—
লক্ষ নারীর মন যোগাইয়া প্রেমের মরা আপনি মরে
চিন গে মানুষ ধরে, ও তুই চিন গে মানুষ ধরে।।
কোন মন্তব্য নেই